দল বেঁধে পড়ে চাকরির বাজারে সফল ঠাকুরগাঁওয়ের ‘স্টাডি গ্রুপ’
তাজিরুল ইসলাম,ঠাকুরগাঁও:
আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২৬
পরীক্ষা শেষে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর বলে দিচ্ছেন একজন। বাকিরা নিজেদের উত্তরপত্রের সঙ্গে তা মিলিয়ে নিচ্ছেন।
‘এক-এ তিন, দুই-এ দুই, তিন-এ এক, চার-এ চার, পাঁচ-এ তিন, ছয়-এ …’ খেলার মাঠে এমন ছন্দ শুনে থমকে দাঁড়ান অনেক পথচারী। ব্যস্ততার মধ্যেও একটুখানি দাঁড়িয়ে লোহার গ্রিলের ফাঁকে উঁকি দিয়ে ছন্দের উৎস খোঁজেন কেউ কেউ। উৎসের সন্ধান পেয়ে একটুখানি মুচকি হেসে আবার চলতে শুরু করেন পথচারীরা।
এই ছন্দটি চাকরিপ্রত্যাশীদের দল বেঁধে প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শেষে বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রের সঙ্গে উত্তর মিলিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা। দল বেঁধে এই চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিকে তাঁরা বলছেন ‘স্টাডি গ্রুপ’।
ঠাকুরগাঁও শহরের সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠের ঈদগাহ মিনারের পাশে ৬০ জনের একটি দলকে দেখা গেল। কেউ ফুটপাতে বসে আবার কেউ দাঁড়িয়ে। সবার হাতে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তরপত্র। আর তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সঠিক উত্তরটি বলে দিচ্ছেন একজন, বাকিরা নিজ নিজ উত্তরপত্রের সঙ্গে তা মিলিয়ে নিচ্ছেন।
জানা গেছে, দল বেঁধে পরীক্ষার এমন প্রস্তুতির গ্রুপের মূল দায়িত্বে আছেন জপেন চন্দ্র। কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা জপেন চন্দ্র এই দলে লেখাপড়ার চর্চা করে এখন বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি করছেন। জপেন চন্দ্র বলেন, ২০১৯ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন শেষে চাকরি খুঁজছিলেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছিলেন না। পরে জপেন ও তাঁর কয়েকজন বন্ধুর দল বেঁধে চাকরির প্রস্তুতির বিষয়টি ভাবনায় আসে। সেই থেকে শুরু এই স্টাডি গ্রুপের।
শুরুতে সদস্যসংখ্যা ৭-৮ থাকলেও পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষ করা আরও কয়েকজন। দেখতে দেখতে একসময় এই দলে অর্ধশতাধিক সদস্য হয়ে যায়। বর্তমানে এই গ্রুপে ৬৫ জন সদস্য আছেন। তবে পরীক্ষায় নিয়মিত অংশ নেন ৫০ থেকে ৫৫ জন।
এই দলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে বছর দেড়েক আগে এনটিআরসিএ আয়োজিত বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মঞ্জুর ইসলাম। মঞ্জুর বলেন, ‘স্নাতকোত্তর শেষ করার পরে চাকরির কোচিং করতে কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা যে পরিমাণ টাকা চান, তা আমাদের দেওয়া সম্ভব ছিল না। সেদিনই আমরা ছয় বন্ধু মিলে নিজেরাই চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সিদ্ধান্ত আমাদের বিফল করেনি।’
সিলেবাস ও প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়া
যখন যে নিয়োগ পরীক্ষা সামনে আসে, তখন সেই পরীক্ষার আলোকে দলের সদস্যরা অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে তৈরি করেন সিলেবাস। সেই সিলেবাস অনুসারে সপ্তাহের রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার মূল্যায়ন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আর অন্যদিনগুলোয় চলে পরীক্ষার প্রস্তুতি।
পরীক্ষার জন্য পর্যায়ক্রমে একজন সদস্য প্রশ্নপত্র তৈরি করার দায়িত্ব নেন। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে ৯০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থাকে। যেদিন যাঁর প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা হয়, সেদিন তাঁর পরীক্ষা দেওয়া হয় না। পরীক্ষা শেষে একে অন্যের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া তিন পরীক্ষার্থীকে দেওয়া হয় উপহার। প্রশ্নপত্র তৈরিতে নিজেরাই প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে চাঁদা দেন দলের সদস্যরা। সেই টাকায় প্রশ্ন কম্পোজ করা, ফটোকপি করা, পুরস্কার কেনা ছাড়াও কখনো কখনো করা হয় সবার জন্য হালকা নাশতার ব্যবস্থা।
সুফল পেয়েছেন অনেকেই
স্টাডি গ্রুপের নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে অনেকেরই চাকরি হয়েছে। জপেন চন্দ্র বলেন, এই দল থেকে নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করে তিনজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর, প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ বিভিন্ন দপ্তরে ৫০ জন চাকরি পেয়েছেন। সামনেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা। ওই সব পরীক্ষায় এই গ্রুপ থেকে অনেকেই ভালো ফল করবেন বলে আশা তাঁর।
এই দলে চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুপারিশ পেয়েছেন বৃষ্টি রানী রায়। তিনি বলেন, ‘যাঁরা চাকরিপ্রার্থী তাঁরা এই গ্রুপ থেকে অত্যন্ত উপকার পাবেন। এখানে রুটিন অনুযায়ী পড়ালেখার পাশাপাশি পরীক্ষারও প্রস্তুতি হয়ে যাচ্ছে। আমি এখানে যেসব প্রশ্ন চর্চা করেছি, সেগুলো বেশির ভাগই নিয়োগ পরীক্ষায় এসেছিল।’
এত দিন একা একা বাড়িতে থেকে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মো. সোহেল। কিন্তু জটিল বিষয়গুলোর সমাধান নিয়ে তিনি হতাশায় ছিলেন। এখন স্টাডি গ্রুপে এসে যেকোনো চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে তিনি আত্মবিশ্বাসী বলে জানালেন।
এই দলের সদস্য রিতা রানী, আনোয়ার হোসেন, মো. সোহেল, মো. শহীদুজ্জামানসহ অনেকেই জানালেই, দল বেঁধে পরীক্ষার প্রস্তুতির সুফল পাচ্ছেন তাঁরা। জপেন চন্দ্রের অনুপস্থিতিতে দলটি পরিচালনা করছেন রতন রায়। রতন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজিতে লেখাপড়া শেষ করে এখন চাকরির চেষ্টা করছেন। রতন বললেন, স্টাডি গ্রুপের সদস্যদের কার্যক্রম শুধু পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। একসঙ্গে রুটিনমাফিক পড়াশোনা করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে। তাঁরা একে অপরের বিপদে-আপদে সহযোগী হয়ে উঠছেন। সদস্যদের প্রত্যেকের রক্তের গ্রুপের তালিকা করা আছে। কারও রক্তের দরকার হলেই গ্রুপের সদস্যরা এগিয়ে আসেন।
মন্তব্য (0)
সম্পর্কিত সংবাদ
পাঁচবিবি উপজেলার আওলাই ইউনিয়নে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার শুভ উদ্বোধন
22 Aug 2026
লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে চুরি ছিনতাই কারী সিন্ডিকেট এর হাতে জনগণ জিম্মি
22 Aug 2026
কাজিপুরে যমুনা পার হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা নিবেদন
22 Aug 2026
লালমনিরহাটে বখাটেদের আঘাতে আহত- অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সেই শিক্ষক আরিফুল ইসলামের চির বিদায়
22 Aug 2026
রামুতে আইকন পরিবহনের এসি বাসে অগ্নিকাণ্ড, জানালা ভেঙে ৩০ যাত্রী উদ্ধার
22 Aug 2026