অবহেলায় অন্ধকারে জাফরাবাদ–ভবানীপুর: উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত সহস্রাধিক মানুষ
শহিদুল ইসলাম নিকলী,কিশোরগঞ্জ:
৭ এপ্রিল ২০২৬
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের জাফরাবাদ ও ভবানীপুর গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো পৌঁছায়নি উন্নয়নের সুবাতাস। দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, তখন এই দুই গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ এখনো মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত—যা এক বেদনাদায়ক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
উন্নয়নের মূলধারার বাইরে পড়ে থাকা এই জনপদ যেন সময়ের চাকা থেকে বিচ্ছিন্ন এক নীরব সাক্ষী। বছরের পর বছর ধরে অবহেলা আর প্রতিশ্রুতির বেড়াজালে আটকে আছে এলাকাবাসীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনা।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম দুর্ভোগ
সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় যোগাযোগ ব্যবস্থায়। পুরো গ্রামজুড়ে নেই কোনো পাকা সড়ক, এমনকি একটি চলাচলযোগ্য কাঁচা পথও গড়ে ওঠেনি আজ পর্যন্ত। বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুম—সব সময় নৌকাই একমাত্র ভরসা।
ফলে রোগী পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এলাকাবাসী। জরুরি মুহূর্তে এই বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
সেতুহীন নদী, অদৃশ্য দেয়াল
জাফরাবাদ ও ভবানীপুর গ্রামের মাঝখানে প্রবাহিত সোয়াইজনি নদী যেন এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথই একমাত্র ভরসা হওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা বিরাজ করছে। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী পরিবহন কিংবা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা।
শিক্ষাব্যবস্থায় শূন্যতা
এলাকায় নেই কোনো প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ফলে শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। দূরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে না পেরে অনেকেই অল্প বয়সেই ঝরে পড়ছে।
শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি পুরো প্রজন্ম অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে—যা শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় উন্নয়নের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনেও বাধা
গ্রামবাসীর নিজস্ব উদ্যোগে চাঁদা তুলে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হলেও, সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় মুসল্লিদের জামাতে নামাজ আদায় করতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এটি আরও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এতে সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি ও ক্ষোভ
এলাকাবাসীর প্রধান দাবি—
সোয়াইজনি নদীর ওপর একটি টেকসই সেতু নির্মাণ
গ্রামে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা
একটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
তাদের বিশ্বাস, এসব মৌলিক অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে বদলে যেতে পারে পুরো এলাকার আর্থ-সামাজিক চিত্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর এত বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের ন্যায্য দাবিগুলো উপেক্ষিত হয়ে আসছে। জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে দিন দিন বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।
সময় এখন কার্যকর উদ্যোগের
টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। জাফরাবাদ–ভবানীপুরের মতো পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নের আওতায় না আনলে ‘সমান উন্নয়ন’ কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।
এখন সময়ের দাবি—দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে এই অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করা। একটি সেতুই বদলে দিতে পারে হাজারো মানুষের জীবন।
জাতীয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় জাফরাবাদ–ভবানীপুর যেন আর পিছিয়ে না থাকে—এটাই এখন এলাকার মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
মন্তব্য (0)
সম্পর্কিত সংবাদ
পাঁচবিবি উপজেলার আওলাই ইউনিয়নে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার শুভ উদ্বোধন
22 Aug 2026
লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে চুরি ছিনতাই কারী সিন্ডিকেট এর হাতে জনগণ জিম্মি
22 Aug 2026
কাজিপুরে যমুনা পার হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা নিবেদন
22 Aug 2026
লালমনিরহাটে বখাটেদের আঘাতে আহত- অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সেই শিক্ষক আরিফুল ইসলামের চির বিদায়
22 Aug 2026
রামুতে আইকন পরিবহনের এসি বাসে অগ্নিকাণ্ড, জানালা ভেঙে ৩০ যাত্রী উদ্ধার
22 Aug 2026