একটি জাতির নীরব আত্মহনন: যখন মহামারিই জাতীর নিয়তি
মোঃ মাসুম আহমেদ
বরিশাল জেলা প্রতিনিধি
ভূমি অফিস থেকে পাসপোর্ট অফিস, থানা থেকে আদালত, কিংবা জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল হাসপাতাল—আমাদের চারপাশের পরিচিত দেওয়ালগুলোর দিকে তাকালে আজ একটি কথাই মনে হয়: আমরা কি কোনো সুস্থ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস করছি, নাকি এক সুবিশাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধিকে নিয়তি বলে মেনে নিয়েছি?
দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ঘুষ—এগুলো আজ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এগুলো আমাদের জাতীয় জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা এক মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
এটি একদিনে হয়নি, যুগে যুগে গড়ে ওঠা এক সংস্কৃতি:
সবচেয়ে বড় সত্য হলো, এই অবক্ষয় আজকের কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। যুগের পর যুগ ধরে, দশকের পর দশক ধরে এই পচনকে সযত্নে লালন করা হয়েছে। ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু টেবিলের তলা দিয়ে ফাইল ছাড়ানোর কিংবা ক্ষমতার জোরে আইনকে পকেটে পোরার এই সংস্কৃতি কখনোই থামেনি। বরং সময়ের সাথে সাথে এটি আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক এবং গা-সওয়া হয়ে উঠেছে। যা একসময় ছিল লোকলজ্জার বিষয়, আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘নিয়ম’।
এই দীর্ঘস্থায়ী ঘুণপোকাগুলো কীভাবে একটা জাতিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে, তা একটু গভীরভাবে ক্ষতিয়ে দেখা দরকার:
মেধার নির্বাসন ও অযোগ্যতার রাজত্ব: যখন মেধা আর যোগ্যতার চেয়ে “মামা-খালুর জোর” কিংবা ‘পারিবারিক পরিচয়’ বড় হয়ে ওঠে, তখন থমকে যায় একটি দেশের প্রগতির চাকা। যোগ্য মানুষটি যখন তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র উপহার পায় একদল মেরুদণ্ডহীন, অযোগ্য কর্মকর্তা/শাসক। থানা কিংবা আদালতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় যখন এই অযোগ্যতা ভর করে, তখন সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থলটুকুও ভেঙে পড়ে এবং ধূলিসাৎ হয়ে যায় মানুষের ন্যায়বিচার এমনকি ভবিষ্যৎ স্বপ্ন।
অধিকার যখন কেনাবেচার পণ্য: পাসপোর্ট অফিসে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে, ভূমি অফিসে নিজের পৈতৃক ভিটের অধিকার রক্ষা করতে কিংবা হাসপাতালে একটু ন্যূনতম চিকিৎসা পেতেও যখন টেবিলে টাকা ছুঁড়তে হয়—তখন বুঝতে হবে সমাজটা আর সুস্থ অবস্থায় নেই। ঘুষ এখানে শুধু অন্যায় নয়, এটি অধিকারকে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে। যার টাকা নেই, এই ব্যবস্থায় সে যেন এক অদৃশ্য, মূল্যহীন নাগরিক।
নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ: সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে আমাদের মনস্তত্ত্বে। যুগের পর যুগ ধরে এই পরিবেশ দেখতে দেখতে আমাদের নতুন প্রজন্ম চোখের সামনে দেখছে—পরিশ্রম কিংবা সততা নয়, বরং চোরাপথ আর টাকাই সাফল্যের চাবিকাঠি। এই সংস্কৃতি যখন সামাজিকভাবে স্থায়িত্ব পেয়ে যায়, তখন একটি জাতির নৈতিক মৃত্যু ঘটে।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো বহিরাগত শত্রুর আক্রমণে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ এই দীর্ঘমেয়াদি নৈতিক পচনই বড় বড় সভ্যতাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। হাসপাতাল যেখানে জীবন বাঁচানোর কথা, থানা যেখানে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, আদালত যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা—সেখানে যদি দুর্নীতির এই মহামারি চিরস্থায়ী রূপ নেয়, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য।
যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই নীরব আত্মহনন এবার বন্ধ হওয়া দরকার। দেওয়ালের পিঠ ঠেকে গেছে অনেক আগেই। এই প্রাতিষ্ঠানিক পচন থেকে মুক্তি না মিললে, আমরা হয়তো ভৌগোলিক মানচিত্রে টিকে থাকব, কিন্তু একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর শক্তি থাকবে না চিরতরে হারিয়ে ফেলব।
এখনই সময় চোখ খোলার, এই দীর্ঘমেয়াদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গনজাগরন তোলার।
মন্তব্য (0)
সম্পর্কিত সংবাদ
চরফ্যাশন মেঘনা নদী থেকে অর্ধ গলিত নারীর মরদেহ উদ্ধার
10 Aug 2026
বরিশালে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে আহত তিনজন
04 Aug 2026
একটি জাতির নীরব আত্মহনন: যখন মহামারিই জাতীর নিয়তি
26 Jul 2026
সামান্য বৃষ্টি হলেই বরিশালের কাজীপাড়ার রাস্তার বেহাল দশা
12 Jul 2026
বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল দালালদের দৌরাত্ম্য অপরদিকে ঘড়ির কাঁটা ধরে চিকিৎসকদের দায়িত্ব
24 Jun 2025